September 12, 2026, 9:02 pm
শিরোনাম :
অভয়নগরে যুবকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার অভয়নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ করলেন এমপি গোলাম রসুল অভয়নগরে জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীল সমাবেশ অনুষ্ঠিত অভয়নগরে ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে এ+ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অভয়নগরে জাতীয় মৎস্য পক্ষ উদযাপন প্রশাসনের উদাসীঅভয়নগরে দুই দোকানের টিন কেটে চুরি অভয়নগরে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল পরিষ্কারে এলাকাবাসী, পরিদর্শনে এমপি গোলাম রসুল আমডাঙা খালে কচুরিপানা অপসারণে স্বেচ্ছাশ্রম : সংস্কারের দাবি নওয়াপাড়ায় জামায়াতের গণসমাবেশ ও গণমিছিল : জুলাইয়ের চেতনায় নতুন বাংলাদেশ গঠনের আহ্বান অভয়নগরে বিএনপির নেতৃত্বে মিছিল অনুষ্ঠিত

অভয়নগরে ভৈরব নদের নাব্যতা সংকটে লোড-আনলোড ব্যাহত : ক্ষতির মুখে ব্যবসায়ীরা

মফিজুর রহমান
0-4024x1784-0-0-{}-0-12#

যশোরের অভয়নগর উপজেলার শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী নওয়াপাড়ার প্রাণ হিসেবে পরিচিত ভৈরব নদ। এক সময় এই নদীপথ দিয়েই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পণ্যবাহী বড় বড় জাহাজ, কার্গো ও নৌযান নওয়াপাড়া বন্দরে আসা-যাওয়া করত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নদীর নাব্যতা সংকট, পলি জমে চর সৃষ্টি এবং নিয়মিত খননের অভাবে বর্তমানে ভৈরব নদ তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারাতে বসেছে। ফলে নদীপথে পণ্য পরিবহন ও লোড-আনলোড কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

অন্যদিকে পলির কারনে কার্গো জাহাজ জেটির কাছে ভিড়তে না পারায় মালামাল লোড-আনলোড করতে পারছেনা। এতে বিপাকে পড়েছেন নওয়াপাড়ার ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান মালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন খাতের মানুষ।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল নওয়াপাড়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার টন সার, খাদ্যশস্য, কয়লা, ক্লিংকার, সিমেন্ট, পাথর, ভোজ্যতেল ও অন্যান্য শিল্প কাঁচামাল নদীপথে পরিবহন করা হয়। কিন্তু নদীর বিভিন্ন স্থানে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় বড় কার্গো জাহাজগুলো বন্দরে প্রবেশ করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে জোয়ারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও মাঝপথে আটকে পড়ছে পণ্যবাহী নৌযান।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, নদীর গভীরতা কমে যাওয়ার কারণে বড় জাহাজের পরিবর্তে ছোট নৌযানে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য খালাস ও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চলের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, “ভৈরব নদ আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। নদী সচল না থাকলে বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের কার্যক্রমও হুমকির মুখে পড়বে। বর্তমানে অনেক জাহাজ কম মাল নিয়ে চলাচল করছে। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নওয়াপাড়া বন্দর ঘিরে গড়ে উঠেছে শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য নদীপথে পরিবহন করা হয়। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানাগুলোও অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এতে একদিকে যেমন পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নওয়াপাড়া নৌবন্দরের শ্রমিকরা জানান, আগে প্রতিদিন অসংখ্য জাহাজ ও কার্গো বন্দরে ভিড়ত। কিন্তু বর্তমানে নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে জাহাজের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে লোড-আনলোড কাজও কমে এসেছে। এতে শ্রমিকদের আয় হ্রাস পেয়েছে। অনেক শ্রমিক পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

একজন প্রবীণ নৌযান চালক বলেন, “এক সময় ভৈরব নদ দিয়ে সহজেই বড় জাহাজ চলাচল করত। এখন অনেক জায়গায় চর জেগে উঠেছে। জাহাজ চালাতে খুবই ঝুঁকি হয়। জোয়ারের সময় ছাড়া চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ভৈরব নদ শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে। নদীভিত্তিক জীবিকা নির্বাহকারী জেলেরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা জানান, ভৈরব নদকে সচল রাখতে অতীতে কয়েক দফা খনন কার্যক্রম পরিচালিত হলেও তা ছিল অপর্যাপ্ত। নদীর নাব্যতা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন। তারা অবিলম্বে নদীর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন।

নওয়াপাড়া চেম্বার অব কমার্সের নেতারা বলেন, দেশের অর্থনীতিতে নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চল ও নৌবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এখানে উৎপাদিত ও আমদানি-রপ্তানিকৃত পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। ভৈরব নদে নাব্যতা সংকট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে শিল্প ও বাণিজ্য খাত বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলেন, ভৈরব নদ খননের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে। নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সচেতন মহলের দাবি, নদীকে বাঁচাতে হলে শুধু খনন করলেই হবে না; নদী দখল ও দূষণ রোধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেজিং, বৈজ্ঞানিক জরিপ এবং নদী ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
অভয়নগরের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ভৈরব নদ আজ অস্তিত্ব সংকটে। নাব্যতা সংকটের কারণে লোড-আনলোড কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন বাড়ছে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি। তাই শিল্পাঞ্চল ও নৌবন্দরের স্বার্থে দ্রুত নদী খনন এবং নাব্যতা পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।