
যশোরের অভয়নগর উপজেলার আমডাঙা খালের জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সংকট নিরসনে স্বেচ্ছাশ্রমে কচুরিপানা অপসারণ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। দীর্ঘদিন ধরে খালের বিভিন্ন অংশে কচুরিপানা জমে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয়দের উদ্যোগে শনিবার দুপুরে এ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালন করা হয়। খালের পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয়দের এমন উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
শনিবার দুপুরে আমডাঙা খালের কচুরিপানা অপসারণ কর্মসূচি পরিদর্শন করেন অভয়নগর থানা বিএনপির সভাপতি ফরাজী মতিয়ার রহমান। এ সময় তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন এবং খালের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। পরিদর্শনকালে তিনি আমডাঙা খাল দ্রুত সংস্কার ও পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
ফরাজী মতিয়ার রহমান বলেন, ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতা একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর জলাবদ্ধতার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে দিলেই হবে না; পানি নিষ্কাশনের প্রধান খালগুলোকে সচল ও কার্যকর রাখতে হবে। এজন্য আমডাঙা খাল দ্রুত সংস্কার, পুনঃখনন এবং পানি প্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, খালের বিভিন্ন স্থানে কচুরিপানা ও আবর্জনা জমে থাকলে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হয়। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব না হলে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। তাই স্থানীয় জনগণ নিজেদের উদ্যোগে যে কচুরিপানা অপসারণের কাজ করছেন, তা প্রশংসনীয়। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত খালটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজের উদ্যোগ নিতে হবে।
এ সময় খালের পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন মালিকানাধীন বালুর ড্যাম্প থেকে বালুমিশ্রিত পানি সরাসরি খালে ফেলার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপির এই নেতা।
তিনি অভিযোগ করেন, বালুর ড্যাম্প থেকে বালুমিশ্রিত পানি খালে পড়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে খালের তলদেশে বালু ও মাটি জমছে। এতে খালের গভীরতা কমে গিয়ে তলদেশ ক্রমেই ভরাট ও উঁচু হয়ে যাচ্ছে। ফলে পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
ফরাজী মতিয়ার রহমান বলেন, খালকে পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হলে এর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। খালে কোনোভাবেই বালু, মাটি কিংবা বর্জ্য ফেলার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। তা না হলে ভবিষ্যতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও বাধাগ্রস্ত হয়ে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আমডাঙা খাল এলাকার পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার পানি এ খালের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু খালের বিভিন্ন স্থানে কচুরিপানা জমে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও কোথাও খালের তলদেশে পলি, বালু ও মাটি জমে খালের গভীরতা কমে গেছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে থাকার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে খালের বিভিন্ন অংশে কচুরিপানা জমে থাকলেও নিয়মিতভাবে তা অপসারণ করা হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে কচুরিপানার বিস্তার বেড়েছে। পানির ওপর ঘন স্তর তৈরি হওয়ায় অনেক স্থানে খালের স্বাভাবিক চেহারাও পরিবর্তিত হয়েছে। এ অবস্থায় এলাকাবাসী নিজেদের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমে কচুরিপানা অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন।
শনিবারের কর্মসূচিতে স্থানীয় বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নেন। কেউ নৌকায়, কেউ খালের পাড় থেকে কচুরিপানা টেনে তুলে অপসারণ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ কর্মসূচিতে খালের বেশ কিছু অংশ কচুরিপানামুক্ত করা হয়। স্থানীয়রা জানান, প্রয়োজন হলে তারা পর্যায়ক্রমে খালের আরও অংশ পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেবেন।
তবে এলাকাবাসী মনে করেন, শুধু কচুরিপানা অপসারণ করে আমডাঙা খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। এজন্য খালের তলদেশের পলি, বালু ও মাটি অপসারণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী খনন করতে হবে। পাশাপাশি খালের দুই পাড় দখলমুক্ত রাখা, ময়লা-আবর্জনা ও বালুমিশ্রিত পানি খালে পড়া বন্ধ করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সংগঠন ও স্থানীয় বাসিন্দারা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে জলাবদ্ধতা শুধু বর্ষাকালীন সমস্যা নয়; বছরের বিভিন্ন সময়ে পানি নিষ্কাশন নিয়ে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এর প্রভাব পড়ে। মৎস্য ঘের ও কৃষিজমিরও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারাও মনে করেন, পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে যুক্ত খালগুলোকে কার্যকর রাখা না গেলে ভবদহের জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসন করা কঠিন। এ জন্য খালগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা, পলি অপসারণ, প্রয়োজনীয় খনন এবং পানি প্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কর্মসূচি পরিদর্শনকালে ফরাজী মতিয়ার রহমান স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি খালের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং পানি নিষ্কাশনের সমস্যা দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে স্থানীয়দের পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রক্ষায় আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
এ সময় সুন্দরী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বিকাশ মল্লিক, ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতা শিবপদ বিশ্বাস, নওয়াপাড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মল্লিক, বর্তমান সভাপতি মুজিবর রহমান, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আশরাফ হোসেন প্রিন্স, বিএনপি নেতা আবু নওশাদসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়দের দাবি, আমডাঙা খালকে দ্রুত সংস্কারের আওতায় এনে পানি নিষ্কাশনের উপযোগী করা হলে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি খালে বালুমিশ্রিত পানি ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমের এ উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে খালটির পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।
এলাকাবাসী আশা করছেন, আমডাঙা খালের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। শুধু বর্ষা মৌসুমে নয়, সারা বছর খালের পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কার্যক্রম চালু রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।