
যশোরের অভয়নগর উপজেলার আমডাঙ্গা ও রাজাপুর খালের জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সংকট নিরসনে স্বেচ্ছাশ্রমে কচুরিপানা অপসারণ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। দীর্ঘদিন ধরে খালের বিভিন্ন অংশে কচুরিপানা, পলি, বালু ও মাটি জমে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে এ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি শুরু করেন। বুধবার সকাল ১১টায় রাজাপুর খালের কচুরিপানা অপসারণ কর্মসূচি পরিদর্শন করেন যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুল।
এ সময় তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং খালের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। পরিদর্শনকালে তিনি আমডাঙ্গা ও রাজাপুর খাল দ্রুত সংস্কার, পুনঃখনন এবং পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর জলাবদ্ধতার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। শুধু সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পানি নিষ্কাশনের প্রধান খালগুলোকে সচল ও কার্যকর রাখতে হবে।
তিনি বলেন, আমডাঙ্গা ও রাজাপুর খাল এ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খালের বিভিন্ন স্থানে কচুরিপানা ও আবর্জনা জমে থাকলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব না হলে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই স্থানীয় জনগণ নিজেদের উদ্যোগে যে কচুরিপানা অপসারণ করছেন, তা প্রশংসনীয়। তবে স্বেচ্ছাশ্রমে কচুরিপানা অপসারণ স্থায়ী সমাধান নয়। খালটি দ্রুত সংস্কার ও পুনঃখননের উদ্যোগ নিতে হবে।
এমপি আরও বলেন, খালের তলদেশে দীর্ঘদিন ধরে পলি, বালু ও মাটি জমে খালের গভীরতা কমে যাচ্ছে। ফলে পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের সক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। খালকে পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হলে এর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
পরিদর্শনকালে খালের পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন মালিকানাধীন কয়লা-বালুর ড্যাম্প থেকে কয়লা ও বালুমিশ্রিত পানি সরাসরি খালে ফেলার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি অভিযোগ করেন, এসব ড্যাম্প থেকে বালুমিশ্রিত পানি খালে পড়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে খালের তলদেশে বালু ও মাটি জমছে। এতে খাল ক্রমেই ভরাট ও অগভীর হয়ে পড়ছে। ফলে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা কমে গিয়ে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, খালে কোনোভাবেই বালু, মাটি, বর্জ্য কিংবা অন্য কোনো ধরনের দূষিত পানি ফেলার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে খালের দুই পাড় দখলমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আমডাঙ্গা খাল এলাকার পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার পানি এ খালের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খালের বিভিন্ন অংশে কচুরিপানা জমে থাকায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও কোথাও খালের তলদেশে পলি, বালু ও মাটি জমে গভীরতা কমে গেছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে পানি জমে থাকার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বছরের পর বছর খালের বিভিন্ন অংশে কচুরিপানা জমলেও নিয়মিতভাবে তা অপসারণ করা হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে কচুরিপানার বিস্তার বেড়েছে। অনেক স্থানে পানির ওপর ঘন স্তর তৈরি হওয়ায় খালের স্বাভাবিক চেহারাও পরিবর্তিত হয়েছে। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় খালের কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় এলাকাবাসী নিজেদের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমে কচুরিপানা অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন। কর্মসূচিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নেন। কেউ নৌকায় উঠে, আবার কেউ খালের পাড় থেকে কচুরিপানা টেনে তুলে অপসারণ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ কর্মসূচিতে খালের বেশ কিছু অংশ কচুরিপানামুক্ত করা হয়। স্থানীয়রা জানান, প্রয়োজন হলে পর্যায়ক্রমে খালের আরও অংশ পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু কচুরিপানা অপসারণ করে আমডাঙ্গা ও রাজাপুর খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। এজন্য খালের তলদেশে জমে থাকা পলি, বালু ও মাটি অপসারণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনঃখনন করতে হবে। পাশাপাশি খালের দুই পাড় দখলমুক্ত রাখা, ময়লা-আবর্জনা ও বালুমিশ্রিত পানি খালে পড়া বন্ধ করা এবং নিয়মিত পরিচর্যার ব্যবস্থা করা জরুরি।
ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংগঠন পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে জলাবদ্ধতা শুধু বর্ষাকালীন সমস্যা নয়; বছরের বিভিন্ন সময় পানি নিষ্কাশন নিয়ে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে কৃষিকাজ ব্যাহত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মৎস্য ঘের ও কৃষিজমি। অনেক সময় যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারাও মনে করেন, পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে যুক্ত খালগুলো কার্যকর রাখা না গেলে ভবদহের জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসন করা কঠিন। এজন্য খালগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা, পলি অপসারণ, প্রয়োজনীয় পুনঃখনন এবং পানি প্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কর্মসূচি পরিদর্শনকালে এমপি অধ্যাপক গোলাম রসুল স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি খালের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং পানি নিষ্কাশনের সমস্যা দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে খাল, পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
স্থানীয়রা বলছেন, আমডাঙ্গা ও রাজাপুর খাল দ্রুত সংস্কারের আওতায় এনে পানি নিষ্কাশনের উপযোগী করা হলে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে খালে বালুমিশ্রিত পানি, মাটি ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমের পাশাপাশি সরকারি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে খাল দুটির পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।
এ সময় অভয়নগর উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক মশিউর রহমান, বর্তমান আমির সরদার শরীফ হুসাইনসহ উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত আমডাঙ্গা ও রাজাপুর খালের সার্বিক অবস্থা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে খালের পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন সব কার্যক্রম বন্ধ করা গেলে ভবদহের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর অগ্রগতি হবে।