
এক সময় বছরের অধিকাংশ সময় অনাবাদি পড়ে থাকত এক ফসলী জমি। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি আর শুকনো মৌসুমে সেচ সংকটের কারণে কৃষকরা ওই জমি থেকে আশানুরূপ ফলন পেতেন না। কিন্তু এখন সেই চিত্র পাল্টে গেছে।
এক ফসলী জমিতে যশোরের অভয়নগর উপজেলার বিভিন্ন ঝিল-বিলে মৎস্য ঘের তৈরি করে বর্ষা ও অধিক পানির সময় মাছ চাষ এবং শুকনো মৌসুমে ধান ও বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি আবাদ করে সাফল্যের মুখ দেখছেন কৃষকেরা। একই সঙ্গে ঘেরের পাড়ে সবজি চাষ করে বাড়তি আয় হওয়ায় বদলে যাচ্ছে তাদের জীবনমান।
খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলা, বিশেষ করে নদী ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় কৃষকেরা নতুন এই সমন্বিত কৃষি পদ্ধতি গ্রহণ করে লাভবান হচ্ছেন। কৃষি ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারাও এটিকে টেকসই ও লাভজনক কৃষি ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন।
অভয়নগরের স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে এক ফসলী জমিতে বছরে মাত্র একটি ধানের ফসল হতো। অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অতিবৃষ্টি কিংবা খরার কারণে সেই ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। ফলে উৎপাদন খরচ উঠিয়ে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ত। বর্তমানে একই জমিতে মৎস্যঘের তৈরি করে বর্ষাকালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। পানি কমে গেলে ঘেরের ভেতরে ধান ও বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন কৃষকেরা।
অভয়নগর উপজেলার কৃষক আব্দুল জলিল জানান, আগে তার ৫ বিঘা জমিতে বছরে একবার আমন ধান চাষ হতো। এতে সংসারের চাহিদা মেটানোই কঠিন ছিল। কয়েক বছর আগে তিনি জমিতে মৎস্যঘের তৈরি করেন। বর্ষাকালে ঘেরে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া ও পাঙ্গাস মাছ চাষ করেন। শীত মৌসুমে পানি কমে গেলে ধান এবং ঘেরের পাড়ে লাউ, কুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, ঢেঁড়স, মরিচ ও বেগুন চাষ করেন। এখন বছরে কয়েক গুণ বেশি আয় হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আগে যেখানে বছরে এক ফসল থেকে ৫০-৬০ হাজার টাকা আয় হতো, এখন মাছ, ধান ও সবজি মিলিয়ে কয়েক লাখ টাকা আয় হচ্ছে। সংসারের অবস্থাও অনেক ভালো হয়েছে।”
একই এলাকার কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, ঘেরের পাড়ে সবজি চাষ অত্যন্ত লাভজনক। জমির যে অংশ আগে অব্যবহৃত থাকত, এখন সেখানে বিভিন্ন মৌসুমি সবজি উৎপাদন হচ্ছে। এতে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় হচ্ছে।
স্থানীয় বাজারে সবজি বিক্রেতারা জানান, ঘেরের পাড়ে উৎপাদিত তাজা সবজির চাহিদা বেশ ভালো। প্রতিদিন কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের সবজি বাজারে নিয়ে আসছেন। এতে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আশপাশের এলাকাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বিত কৃষি পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একই জমি থেকে একাধিক উৎপাদন পাওয়া যায়। মাছ চাষের কারণে জমিতে পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হয়। আবার মাছের বর্জ্য মাটির উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করে। ফলে ধান ও সবজির ফলনও বৃদ্ধি পায়।
অভয়নগর উপজেলা কৃষি অফিসার লাভলী খাতুন জানান, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষিতে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এক ফসলী জমিকে বহুমুখী উৎপাদনের আওতায় আনতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা লিপটন হোসেন জানান, ঘেরে মাছ চাষের ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে ভালো উৎপাদন পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে দেশীয় প্রজাতির মাছের পাশাপাশি দ্রুত বর্ধনশীল মাছ চাষ করে স্বল্প সময়ে লাভবান হওয়া যায়। অনেক কৃষক মাছ বিক্রির অর্থ দিয়ে পরবর্তী মৌসুমের কৃষি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘেরের পাড়ে সবজি চাষ শুধু আয় বৃদ্ধিই করে না, মাটির ক্ষয়রোধেও সহায়তা করে। এছাড়া পরিবারের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে অনেক নারীও ঘেরের পাড়ে সবজি চাষে যুক্ত হয়ে পরিবারের আয় বাড়াতে অবদান রাখছেন।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, এই পদ্ধতিতে কৃষি উৎপাদন বাড়লেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারজাতকরণ সুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক সময় মাছ ও সবজির ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই সরকারি সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে সফল কৃষকদের দেখে এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও আগ্রহী হয়ে উঠছেন। অনেকেই এক ফসলী জমিকে মৎস্যঘেরে রূপান্তর করে মাছ, ধান ও সবজি চাষ শুরু করেছেন। ফলে কৃষি জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে।
যশোর জেলা কৃষিবিদরা মনে করেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধ ও এক ফসলী জমিতে এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষি উৎপাদন ও মাছের উৎপাদন উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে কৃষকের আয় বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
এক সময় যে জমি থেকে বছরে মাত্র একটি ফসল পাওয়া যেত, আজ সেই জমিই হয়ে উঠেছে মাছ, ধান ও সবজির সমৃদ্ধ খামার। মৎস্যঘেরভিত্তিক এই সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা শুধু কৃষকের আয়ই বাড়াচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে তাদের জীবনযাত্রার মানও। কৃষকের মুখে ফিরেছে হাসি, আর গ্রামীণ অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।