
যশোরের ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে যে বিকল্প নিষ্কাশন পথ হিসেবে আমডাঙ্গা খালকে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই খাল এখন শেওলার দখলে। ঘন সবুজ শেওলার স্তর খালের পানি প্রবাহ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে কৃষি জমি ও মৎস্য ঘের এখনও পানির নিচে ডুবে আছে। সামনে বর্ষা মৌসুম-এ অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে শত শত কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষক ও মৎস্যচাষিরা।
ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষ পানিনিষ্কাশনের দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। জলাবদ্ধতা নিরসনে বিকল্প পথ হিসেবে আমডাঙ্গা খাল খনন ও সংস্কার করা হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটি এখন প্রায় অচল। স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের বেশিরভাগ অংশে পুরু শেওলা জমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বিল ঝিকরার পানি নিষ্কাশনের একমাত্র কার্যকর পথ হলো আমডাঙ্গা খাল হয়ে ভৈরব নদে প্রবাহ। কিন্তু খালে শেওলা জমে পানি নামতে পারছে না। ফলে বিল ঝিকরার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে। কয়েক মাস ধরে জমে থাকা পানিতে ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ কেউ বোরো ধান রোপণ করতে পারেননি, আবার কেউ আবাদ করেও ফলন পাননি।
কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, “আমাদের জমি তিন মাস ধরে পানির নিচে। খালে শেওলা জমে পানি নামছে না। সামনে বর্ষা আসছে। যদি এখনই শেওলা পরিষ্কার না করা হয়, তাহলে বাড়িঘর পর্যন্ত তলিয়ে যাবে।”
মৎস্যচাষিরাও একই সঙ্কটে। ভবদহ অঞ্চলে অসংখ্য মাছের ঘের রয়েছে। দীর্ঘদিন পানিবন্দি অবস্থায় ঘেরে পানির গুণগত মান নষ্ট হয়েছে। অতিরিক্ত স্থির পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, ফলে মাছের মৃত্যু বাড়ছে। অনেক ঘেরে ইতোমধ্যে মাছ মরে ভেসে উঠেছে। চাষিরা বলছেন, সময়মতো পানি নিষ্কাশন না হলে পুরো মৌসুমের বিনিয়োগই ডুবে যাবে।
মৎস্যচাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে মাছের পোনা ছেড়েছি। কিন্তু পানি না নামায় ঘেরের অবস্থা খারাপ। যদি বর্ষার পানি আসে, সব ভেসে যাবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। তখন শুধু কৃষিজমি ও মাছের ঘের নয়, বসতবাড়িও পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও বাজারগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে জনজীবনে নেমে আসবে চরম দুর্ভোগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খালে শেওলা জমার মূল কারণ হলো পানির স্থিরতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। পানি প্রবাহ স্বাভাবিক থাকলে শেওলা এত দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে না। কিন্তু খালটির কিছু অংশে পলি জমে গভীরতা কমে গেছে। ফলে পানি চলাচল কমে গিয়ে শেওলা জন্মানোর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে খালের শেওলা অপসারণ ও পলি খননের কাজ শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে বিল ঝিকরা থেকে ভৈরব নদ পর্যন্ত পুরো নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কোটি কোটি টাকার কৃষি উৎপাদন ও মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে।
এ অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষি ও মৎস্যনির্ভর। ধান, পাট, শাকসবজি চাষ এবং মাছের ঘের—সবই পানিনির্ভর কার্যক্রম। জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতি নয়, আগামী মৌসুমের উৎপাদনও ব্যাহত হবে। কৃষকরা ঋণের বোঝা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়বেন। অনেকেই জমি বিক্রি করতে বাধ্য হতে পারেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা স্বীকার করেছেন, সমস্যাটি গুরুতর। তারা জানান, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষার আগে একই প্রতিশ্রুতি মিললেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেরি হয়। এতে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
পরিবেশবিদদের মতে, খাল ও নদীকে বাঁচাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু শেওলা পরিষ্কার করলেই হবে না; নিয়মিত নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। খালের দুই পাড় দখলমুক্ত রাখা, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এমন সব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
অন্যদিকে, কৃষকরা এখনই দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চান। তাদের ভাষায়, “কাগজে-কলমে কাজ নয়, মাঠে কাজ চাই।” কারণ সামনে বর্ষা। কয়েক দফা ভারী বৃষ্টি হলেই পুরো এলাকা আবারও জলমগ্ন হয়ে পড়বে। তখন ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
ভবদহ অঞ্চলের মানুষ বহু বছর ধরে জলাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। উন্নয়ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও টেকসই সমাধান মিলছে না। এবারও যদি দ্রুত শেওলা অপসারণ ও খাল সংস্কারের কাজ না হয়, তাহলে কৃষক ও মৎস্যচাষিদের জন্য তা হবে চরম বিপর্যয়।
স্থানীয়দের ভাষায়, “আমডাঙ্গা খালের শেওলা এখন আমাদের গলার কাঁটা।” এই কাঁটা না সরালে বর্ষা মৌসুমে আবারও ডুববে ফসল, ভেসে যাবে মাছের ঘের, আর সর্বস্বান্ত হয়ে পথের ফকিরে পরিণত হবেন শত শত কৃষক পরিবার। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবদহের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘ হবে—এমনটাই আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট সবার।
এব্যাপারে অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ সালাউদ্দীন দিপু জানান, আমডাঙ্গা খালের শেওলার বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনি বললেন আমি জানতে পারলাম। বিষয়টি আমি খোজ নিয়ে দেখবো।
এব্যাপারে যশোর-৪ আসনের এমপি অধ্যাপক গোলাম রুসল জানান, ভবদহের বিকল্প হলো আমডাঙ্গা খাল। এই খাল দিয়ে পানি গিয়ে ভৈরব নদে নিস্কাশন হয়। যে কারণে বিল ঝিকরাসহ কয়েকটি বিলের অধিকাংশ জমি চাষাবাদ হয়। কিন্তু বর্তমান এই খালে শেওলা জমে পানির স্রোত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই শেওলা পরিস্কার না করলে পানি নিস্কাশন হচ্ছেনা। যত দ্রুত সম্ভব এই শেওলা পরিস্কারের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হবে।