October 29, 2026, 2:11 am

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প: এবার ভুয়া নিয়োগ দিয়ে টাকা হাতানোর অভিযোগ

Reporter Name

ডেস্ক রিপোর্ট: বিগত সরকারের আমলে নেওয়া তিন হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে নতুন করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কৃষিকাজে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি শুরু হলেও শুরু থেকেই এটি নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। সম্প্রতি এই প্রকল্পের আওতায় আউটসোর্সিংয়ের নামে ভুয়া নিয়োগ দেখিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এ বিষয়ে একাধিক ভুক্তভোগী ব্যক্তি প্রকল্প পরিচালক এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। প্রকল্পের কার্যালয়ে হিসাবরক্ষকের ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপপরিচালক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে পুরো বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। এর আগে বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে সাবেক প্রকল্প পরিচালকসহ মোট আটজন কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যেই বহিষ্কার করা হয়েছিল।

তদন্তের নির্দেশ দিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সম্প্রতি একটি চিঠি জারি করা হয়, যেখানে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের হিসাবরক্ষক মো. মাসুম রেজার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। অধিদপ্তরের অধীনস্থ বিভিন্ন প্রকল্পে দৈনিক মজুরি ও আউটসোর্সিংয়ের ভিত্তিতে জনবল নিয়োগের কথা বলে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে মাসুম রেজা ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে এবং দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ নির্দেশ প্রদান করেছে। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. মুরাদুল হাসান গণমাধ্যমকে জানান যে, আগামী দশ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা এই প্রকল্পের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। এদিকে, সৌমিক আরাফাত নামের এক ভুক্তভোগী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগে জানান যে, হিসাবরক্ষক মো. মাসুম রেজা ও প্রকল্পের গাড়িচালক শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। অফিস সহায়ক পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে সৌমিকের কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী গাড়িচালকের স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লাখ টাকা জমা নেওয়া হয়। অভিযুক্ত হিসাবরক্ষক মো. মাসুম রেজা গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি টাকাগুলো নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তা আবার ফেরতও দিয়েছেন। তবে খামারবাড়িতে অর্থ লেনদেন ছাড়া কোনো ধরনের নিয়োগ হয় না বলে তিনি চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন। অপর এক ভুক্তভোগী জহিরুল ইসলামও গাড়িচালক শফিকুলকে দুই লাখ টাকা দিয়ে কোনো ধরনের নিয়োগপত্র ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প কার্যালয়ে কাজ করার অভিযোগ করেছেন। টাকা দেওয়ার পর তিনি কোনো বেতন-ভাতা বা অফিশিয়াল নিয়োগপত্র পাননি এবং টাকা ফেরত পেতে প্রকল্প পরিচালকের কাছে ঘুরেও কোনো প্রতিকার পাননি। বিগত সরকারের মেয়াদে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে মেয়াদ শেষের দিকে এসেও চরম স্থবিরতা দেখা দেয় এবং অব্যবহৃত প্রায় চারশ কোটি টাকা মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়। প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ থাকা সত্ত্বেও নিয়ম ভেঙে আয়াত সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড নামক একটি কোম্পানিকে দিয়ে লোক নিয়োগের চেষ্টা চালানো হয়, যার মাধ্যমে ৭৭ জন কর্মী নিয়োগের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে প্রচারণা চালানো হয়। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কোনো প্রশাসনিক আদেশ ছাড়াই লোক নিয়োগের এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনৈতিক বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে প্রকল্প পরিচালক মঞ্জুর-উল-আলম দাবি করেছেন যে, নিয়োগপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির আগেই তাঁরা দরপত্র আহ্বান করেছিলেন। অন্যদিকে, প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ৭৭ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী গত প্রায় ষোলো মাস ধরে কোনো ধরনের বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে। খামারবাড়ির প্রকল্প কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় কর্মীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন এবং দুর্নীতির অভিযোগে সেখানে বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রম চলছে। প্রকল্প পরিচালকের কক্ষ তালাবদ্ধ থাকা নিয়ে নতুন করে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে অন্য কর্মকর্তাদের উদ্যোগে সেই তালা ভেঙে নতুন তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। সদ্য সাবেক প্রকল্প পরিচালক মঞ্জুর-উল-আলমের মেয়াদ শেষ হলেও তিনি কক্ষটি ছাড়তে নারাজ ছিলেন এবং প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়াতে এখনো বিভিন্ন মহলে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম জানিয়েছেন যে, এই প্রকল্প নিয়ে নানা দুর্নাম রয়েছে এবং মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। অনিয়ম ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।