যশোরের মনিরামপুরে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। মাদক ব্যবসার অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যক্তির স্ত্রী এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির ছেলেকে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বিএনপির দুই নেতা। তাঁরা প্রকাশিত সার ডিলার তালিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) তাঁরা পৃথকভাবে এ অভিযোগ করেন। এদিকে সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর তৃণমূল বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মনিরামপুর উপজেলার দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নে বিসিআইসি সার ডিলার হিসেবে মেসার্স জান্নাতুল ফেরদাউস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রওশনারা খাতুন এবং শ্যামকুড় ইউনিয়নে মেসার্স জামান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সালাহ উদ্দিনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের নিয়োগের বৈধতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা।
দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম তাঁর লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, রওশনারা খাতুন চলতি বছর ফ্যামিলি কার্ড শুমারির ইউনিয়ন সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর স্বামী আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সম্প্রতি গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে আফজাল হোসেনকে মাদক বিক্রির নগদ ৪৩ হাজার টাকা ও ইয়াবাসহ আটক করা হয়। এ ঘটনায় মনিরামপুর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা রয়েছে বলে অভিযোগকারী দাবি করেছেন। পাশাপাশি জামালপুর সদর থানায় প্রতারণার একটি মামলায় তাঁর দুই বছরের সাজা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও আদালতের রায় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, শ্যামকুড় ইউনিয়ন বিএনপির নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য ফজলুর রহমান তাঁর অভিযোগে বলেন, ওই ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মেসার্স জামান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সালাহ উদ্দিনের বাবা আব্দুল কাশেম নাগোরঘোপ-হাসাডাঙ্গা এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফজলুর রহমানের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও পারিবারিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। তাঁর দাবি, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ছাড়া উপজেলার রোহিতা ও ঝাঁপা ইউনিয়নে নতুন সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগকারীরা পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ক্ষোভ
সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়ন যুবদলের নেতা কামারুল ইসলাম ও চিনাটোলা ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান।
তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, অতীতে যাঁদের কারণে তাঁরা মামলা ও হামলার শিকার হয়েছেন, এখন তাঁদেরই কেউ কেউ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন বলে তাঁরা মনে করছেন। সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়বে।
তাঁদের দাবি, দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের পাশাপাশি সরকারি সুযোগ-সুবিধা বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত।
তবে অভিযোগকারীদের এসব বক্তব্যের স্বাধীন সমর্থন পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রশাসনিক তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ অস্বীকার ডিলারদের
অভিযোগের বিষয়ে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া রওশনারা খাতুন ও সালাহ উদ্দিন তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তাঁদের দাবি, প্রচলিত নিয়মনীতি অনুসরণ করেই তাঁদের সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম করা হয়নি বলেও তাঁরা দাবি করেন।
তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের
এ বিষয়ে মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি সম্রাট হোসেন বলেন, “অভিযোগগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হকও সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, তাঁর নিজের ইউনিয়ন রোহিতায় স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে একই পরিবারের তিনজনের নাম তালিকায় পাঠানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ পেয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, “এসব দুর্নীতির বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রশাসনকে তদন্ত করতে বলা হয়েছে।”
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
স্থানীয়দের মতে, কৃষকদের কাছে সরকারি মূল্যে সার পৌঁছে দেওয়া এবং কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কেউ সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের তদন্তের ফলাফল এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম পাওয়া যায় কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা।
প্রকাশক সম্পাদক: মফিজুর রহমান দপ্তরী
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
ফিরোজ ম্যানসন (২য় তলা)
নওয়াপাড়া, অভয়নগর, যশোর।
www.noaparanews24.com