যশোরের অভয়নগরে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ঋণের কিস্তি আদায়কে কেন্দ্র করে আদ্-দ্বীন এনজিওর এক মাঠকর্মীর বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন জেসমিন বেগম নামে এক নারী। অসুস্থ মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে কিস্তি দিতে না পারার বিষয়টি জানানোর পরও তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। তবে অভিযুক্ত মাঠকর্মী অভিযোগের সব বক্তব্য স্বীকার করেননি।
নিহত মিতু বেগম (১৭) সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। গত সোমবার (২০ অক্টোবর) ভোরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর অসুস্থ হলে তাঁকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) তাঁর মৃত্যু হয়। একদিকে সন্তান হারানোর অসহনীয় শোক, অন্যদিকে ঋণের কিস্তি আদায়কে কেন্দ্র করে কথিত দুর্ব্যবহারের ঘটনা—সব মিলিয়ে ভেঙে পড়েছেন মিতুর মা জেসমিন বেগম।
হাসপাতালে মেয়ে, বাড়িতে কিস্তির টাকা চাইতে এনজিওকর্মী
পরিবারের অভিযোগ, গত সোমবার মিতুকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর আদ্-দ্বীন এনজিওর সিঙ্গাড়ী আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাঠকর্মী ফাতেমা খাতুন তাঁদের বাড়িতে কিস্তির টাকা চাইতে যান। এ সময় মেয়ের গুরুতর অসুস্থতার কথা জানিয়ে কিস্তি পরিশোধের জন্য সময় চান জেসমিন। কিন্তু তাঁর সেই পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে মাঠকর্মী দুর্ব্যবহার ও গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
জেসমিন বেগমের দাবি, ওই কিস্তির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১০০ টাকা। মেয়ের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হাসপাতালে থাকার কারণে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে টাকা দিতে পারেননি। এ অবস্থায় তাঁর সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জেসমিনের অভিযোগ, মাঠকর্মী তাঁকে এমন কথাও বলেছেন যে তাঁর মেয়ে বাঁচল কি মরল, তাতে কিছু যায় আসে না। কিস্তির টাকা রেখে না যাওয়ার বিষয়টি নিয়েও তাঁকে কথা শোনানো হয় বলে দাবি তাঁর। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরাও ওই ঘটনার বিষয়ে অভিযোগ করেছেন।
দিনমজুরের সংসারে ঋণের বোঝা
জেসমিন বেগমের স্বামী মিন্টু শেখ পেশায় একজন দিনমজুর। অভাব-অনটনের সংসারে প্রয়োজন মেটাতে তিনি আদ্-দ্বীন এনজিওর সিঙ্গাড়ী কার্যালয় থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। পরিবারটির দাবি, তাঁরা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে আসছিলেন। তবে মেয়ের আকস্মিক অসুস্থতার কারণে ওই সময় কিস্তি দিতে পারেননি।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়েকে বাঁচানোর আশায় যখন তাঁরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, তখন বাড়িতে কিস্তির টাকা চাইতে যাওয়ার ঘটনাটি তাঁদের কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মেয়ের মৃত্যুর পর কথিত দুর্ব্যবহারের বিষয়টি মনে করে আরও ভেঙে পড়ছেন জেসমিন।
স্বজনেরও অভিযোগ
মিতুর শ্বশুর আব্দুল লতিফ অভিযোগ করেন, ঘটনার সময় তিনি হাসপাতালে ছিলেন। তাঁর দাবি, মাঠকর্মীর আচরণে জেসমিন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে অভিযুক্ত কর্মীকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাননি বলে জানান তিনি।
তবে পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত ঘটনা আরও স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগ স্বীকারে আংশিক সম্মতি মাঠকর্মীর
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আদ্-দ্বীন এনজিওর মাঠকর্মী ফাতেমা খাতুন প্রথমে গালিগালাজের অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে তিনি বলেন, মিতুর শারীরিক অবস্থা এতটা গুরুতর ছিল, তা তিনি বুঝতে পারেননি। কিস্তি আদায়ের ক্ষেত্রে অফিসের চাপ থাকে উল্লেখ করে তিনি জানান, রাগের মাথায় জেসমিনকে ‘বেয়াদব’ বলেছিলেন। তবে পরিবারের করা অভিযোগের সব বক্তব্য তিনি স্বীকার করেননি।
ফাতেমা খাতুনের বক্তব্যে কিস্তি আদায়ের সময় কথাকাটাকাটি হওয়ার বিষয়টি উঠে এলেও পরিবারের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
আদ্-দ্বীন এনজিওর সিঙ্গাড়ী শাখার ব্যবস্থাপক আমিরুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি তাঁর জানা নেই। অভিযোগের প্রমাণ আছে কি না, তা দেখতে হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে এনজিওটির এরিয়া ম্যানেজার হারুন-অর-রশীদ বলেন, গ্রাহকদের সঙ্গে এ ধরনের রূঢ় আচরণের নজির তাঁদের প্রতিষ্ঠানে নেই।
প্রকাশক সম্পাদক: মফিজুর রহমান দপ্তরী
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
ফিরোজ ম্যানসন (২য় তলা)
নওয়াপাড়া, অভয়নগর, যশোর।
www.noaparanews24.com